এল নিনোর প্রভাব

বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার শঙ্কা বিশ্বব্যাংকের

বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম নতুন করে এক দফা বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জলবায়ুগত পরিবর্তন বা ‘এল নিনো’র প্রভাবে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাটি জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে সার ও জ্বালানি তেলের বাজারে এরই মধ্যে যে সংকট তৈরি হয়েছে, এল নিনোর বৈরী আবহাওয়া সে পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলতে পারে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের পানির উষ্ণতা বাড়ার ফলে বিশ্বজুড়ে চরম বৈরী আবহাওয়া দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি ও সার পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এ সংকটের মধ্যেই এল নিনোর প্রভাব খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরো ঝুঁকিতে ফেলবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এল নিনোর প্রভাবে খাদ্যপণ্যের দাম আগের সব পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে সাব-সাহারান বা সাহারা মরুভূমিসংলগ্ন আফ্রিকার ছোট অর্থনীতির দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবেলা করার মতো প্রয়োজনীয় বীমা বা আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় এ অঞ্চলের দেশগুলো সবচেয়ে বেশি খাদ্যঝুঁকিতে পড়বে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এরই মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম আকস্মিক বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতি বা পণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা শুরু হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ২ দশমিক ৯ থেকে কমে ২০২৬ সালে ২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। করোনা মহামারীর পর এটিই হবে বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে ধীরগতির প্রবৃদ্ধি। এদিকে জাপানের আবহাওয়া সংস্থা নিশ্চিত করেছে, চলতি সপ্তাহ থেকে বিশ্বজুড়ে এল নিনো পরিস্থিতি পুরোপুরি শুরু হয়ে গেছে। অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, একদিকে সারের চড়া দামের কারণে চাষাবাদ ব্যাহত হওয়া, অন্যদিকে বৈরী আবহাওয়ার জোড়া ধাক্কায় খাদ্যনিরাপত্তা চরম হুমকিতে পড়বে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো জানান, যখন এ দুই সংকট (সার সংকট ও বৈরী আবহাওয়া) একসঙ্গে আঘাত হানে, তখন একে অন্যকে আরো শক্তিশালী করে তোলে। ফলে খাদ্য সংকটের তীব্রতা অনেক বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত এ আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ দেশটির কৃষি খাত পুরোপুরি মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। এরই মধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) এ বিষয়ে সতর্কতা জারি করে সার্বক্ষণিক নজরদারির তাগিদ দিয়েছে। তবে এ আবহাওয়ার কারণে আর্জেন্টিনার মতো বেশকিছু দেশে শস্যের ফলন ভালো হতে পারে।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, সাধারণত একটি শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় দুই বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, এল নিনো শুরুর ১৬ মাসের মধ্যে খাদ্যপণ্যের দাম সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোই এর প্রধান ভুক্তভোগী হয়।

কারণ এসব দেশের সাধারণ মানুষের আয়ের একটি বড় অংশই খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে। এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার আরো দীর্ঘ সময় চড়া রাখতে বাধ্য হয়।

আরও